
স্টাফ রিপোর্টার
মিরপুরে বস্তি উচ্ছেদে গিয়ে তাড়া খেল পুলিশ
রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা কয়েক হাজার ঘর উচ্ছেদ করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের যৌথ দল। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, স্থানীয় লোকজনের ধাওয়া খেয়ে সর্বোপরি হামলা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি এড়াতে ঘটনাস্থল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হন অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যরা।
বুধবার দুপুরে ইসিবি চত্বর-কালশী সড়ক সংলগ্ন বাউনিয়াবাঁধের ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযানে অংশ নেয় পুলিশ, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং উচ্ছেদ কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি। তবে অভিযান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙা শুরু হতেই নারী-পুরুষ মিলে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তারা অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের কার্যকর পূর্ব নোটিশ বা পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এতে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরিস্থিতি দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষ বাড়তে থাকলে পুলিশ সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে দ্রুত দৌড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হচ্ছে, আর পেছন থেকে ধাওয়া করছেন উত্তেজিত লোকজন। ভিডিওগুলো ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে ছিল এবং বহুবার মৌখিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
ফেসবুক-ইউটিউবে ভাইরাল পুলিশের পিছু হটার দৃশ্য
সংঘর্ষের কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ঘটনার একাধিক ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউবে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা চিৎকার করতে করতে পুলিশকে তাড়া করছে। আর হেলমেট ও ঢাল পরিহিত পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বের দিকে যাচ্ছেন। নেটিজেনদের মধ্যে এই ভিডিও নিয়ে এখন তীব্র বিতর্ক চলছে। এক পক্ষ বলছেন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এভাবে হাজার হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করা অমানবিক। অন্য পক্ষের দাবি, সরকারি সম্পত্তি অবমুক্ত করতে প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থান নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
‘বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব?’ ছিন্নমূলের আর্তনাদ ও ক্ষোভ
স্থানীয়দের দাবি, বাউনিয়াবাঁধের ওই অংশে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষের বসবাস। অধিকাংশ পরিবারই নিম্নআয়ের শ্রমজীবী। কেউ রিকশা চালান, কেউ পোশাক কারখানায় কাজ করেন, আবার কেউ দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ উচ্ছেদের কারণে বহু পরিবার খোলা আকাশের নিচে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে বলে জানান বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল ক্ষোভের জায়গাটি হলো প্রশাসনের আকস্মিকতা। তাদের দাবি, কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ কিংবা পুনর্বাসনের ন্যূনতম সুযোগ না দিয়েই এই উচ্ছেদযজ্ঞ চালানো হচ্ছিল। উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বাসিন্দারা বলেন, সকালেও আমরা জানতাম না যে আমাদের ঘরগুলো ভেঙে দেওয়া হবে। দুপুরের দিকে হঠাৎ পুলিশ আর বড় গাড়ি এসে সব তছনছ করা শুরু করে। ঘরের আসবাবপত্র সরানোর সময়টুকুও পাইনি। এই ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে কোথায় দাঁড়াবো?
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলায় কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় বা আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং বিকেল থেকে পুরো এলাকায় কড়া নজরদারি বাড়ানো হয়। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় বস্তি উচ্ছেদ নতুন কিছু নয়। কিন্তু পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া অভিযান পরিচালিত হলে তা প্রায়ই সংঘাত ও মানবিক সংকটে রূপ নেয়। রাজধানীর নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আবাসন নীতির অভাব থাকায় একই ধরনের পরিস্থিতি বারবার তৈরি হচ্ছে বলে মত তাদের।
এদিকে ভাইরাল ভিডিও ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি ও কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। আবার অন্যদের মতে, সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে হঠাৎ করেই অভিযান অচল হয়ে পড়ে। সরকারি কাজে বাধা, হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগে পরবর্তী সময়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রকাশক- জাকিয়া সুলতানা সীমা : সম্পাদক- শেখ মোর্শেদ : কার্যালয়ঃ মাহমুদ শাহ শপিং সেন্টার (২য় তলা), তালতলা পয়েন্ট, সিলেট। ফোনঃ 01782-601095 : 01752-941026 : রেজি নং সিল ১৭০/২০২০ সাল
www.dailyjagratasylhet.com