
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
শাহ্ আরফিন টিলা। কোম্পানীগঞ্জের পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের জালিয়ারপাড় ও চিকাডহর গ্রামের পার্শ্বে এ টিলার অবস্থান। দুই যুগ আগেও এখানে প্রায় ৫শ’ একর জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো টিলাটি। টিলার মাটির নিচে ছিলো বিশাল পাথরের স্তুপ। পুরো টিলা জুড়ে ছিলো সবুজ গাছপালা। তবে এখন এখানে নেই আর কোনো টিলার অস্তিত্ব। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কারনে ধ্বংস হয়ে গেছে টিলাটির চিরচেনা সেই রূপ।
স্থানীয়দের দাবি, সময়ের বিবর্তনে ওই স্থানটিতে কালো থাবা পড়ে পাথরখেকোদের। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ও বছরের পর বছর ধরে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত টিলাটি কেটে লুট হতে থাকে পাথর। ফলে সুউচ্চ ওই টিলাটি ধ্বংস হতে থাকে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সকল পাথর কোয়ারীসহ শাহ্ আরফিন টিলা থেকেও অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে নির্দেশ দেয় তৎকালীন সরকার। তারপর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে শাহ্ আরফিন টিলা থেকে অবৈধভাবে পাথর লুট।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শাহ্ আরফিন টিলা নিয়ন্ত্রণে নেয় নতুন সিন্ডিকেটের মূলহোতা চিকাডহর গ্রামের মৃত ময়না মিয়ার ছেলে হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব। একক আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার করে হাবিব তার গড়া সিন্ডিকেট সদস্যদের নিয়ে ওই টিলা কেটে এবং তাতে শতাধিক কোয়ারী করে আবারও শুরু করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন। বেপরোয়াভাবে টিলা কেটে পাথর লুটের ফলে বর্তমানে টিলাটি বিরানভূমি ও গভীর গর্তে পরিণত হয়েছে। পাথর লুটের নতুন সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছে- হাবিবের বড় ভাই ও মৃত ময়না মিয়ার ছেলে আকদ্দছ, চিকাডহর গ্রামের মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে আব্দুল জব্বার ও খলিল, মৃত ইন্তাজ আলীর ছেলে মানিক মিয়া, মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে আব্দুর রহিম। শাহ্ আরফিন টিলায় তাদের একেকজনের ৪/৫টি করে কোয়ারী রয়েছে বলে জানা যায়। তারা ও তাদের সাথে সিন্ডিকেটে থাকা অন্যান্যরা ইতোমধ্যে শত কোটি টাকার পাথর লুট করে নিয়েছে। সেইসব লুট করা পাথর বিক্রি করার পরও এখনো কয়েক কোটি টাকার পাথর স্টক করে রাখা আছে তাদের বাড়ির আশপাশ ও বিভিন্ন জায়গায়।
পাথর লুটের নতুন সিন্ডিকেটের মূলহোতা হাবিব ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা অবৈধভাবে পাথর লুটের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয় হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী হযরত শাহ্ আরফিন (রহ.)-এর মাজার খ্যাত স্থানটিও। ধ্বংস করে দেয় মাজারের পার্শ্বে অবস্থিত বিশাল বিস্তৃত মাঠ, মসজিদ, কবরস্থান, গাছপালা ও মাজারে যাওয়া-আসার রাস্তাটি। অবাধে টিলা কাটা, কোয়ারী করে পাথর উত্তোলন, যত্রতত্র দিয়ে পাথরবাহী ট্রাক্টর গাড়ির যাতায়াতের কারনে বিপন্ন হতে থাকে শত শত একর ফসলি জমি। বিপাকে আছেন স্থানীয় কৃষকরা।
তবে অতীতে শাহ আরফিন টিলা ধ্বংসে পাথরখেকোদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা নতুন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে না আইনী কোনো পদক্ষেপ। মাঝেমধ্যে চুনোপুঁটিদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হলেও অদৃশ্য কারনে রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে হয়না মামলা। প্রশাসনের করা বিভিন্ন মামলায় আসামিদের নাম দেখলেই বুঝা যায়, শাহ্ আরফিন টিলা থেকে ৫ আগস্টের পর কী পরিমাণ পাথর লুট হয়েছে কিংবা নতুন করে কারা এ লুটপাট ও ধ্বংসে জড়িত, এমন কোনো তালিকা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নেই। ওই টিলায় ৫ আগস্টের পর লুটপাটের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ধারণে নেয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। কোনো পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে না নতুন সিন্ডিকেটের মূলহোতা হাবিব ও তার সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে।
সিলেটের পরিবেশকর্মী ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে পাথর লুটপাটের মূলহোতা হাবিব ও অন্যান্য পাথরখেকো চক্রটি দিনের পর দিন শাহ আরফিন টিলা কেটে ও কোয়ারী করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে আসছে। অবশ্য কিছুদিন ধরে স্থানীয় প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে সেখানে পাথর উত্তোলন ও স্টক করা পাথর লুট বন্ধ ছিলো। কিন্তু এখন আবার পুরোদমে রাতের অন্ধকারে ভিন্ন পথে ভোলাগঞ্জ মিনি স্টেডিয়ামের পার্শ্বে ও বিভিন্ন ক্রাশার মিলে ট্রাক্টর ও মিনি ট্রাক্টরে করে নিয়ে আসছে সেইসব স্টক করা পাথর।