


গত কয়েক সপ্তাহেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঘের হামলায় মানুষ আহত বা নিহত হয়েছেন, উত্তরাঞ্চলে চিতাবাঘের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে এবং পূর্বাঞ্চলে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশে প্রায়ই ঘটে যাওয়া নানা মর্মান্তিক ঘটনার মতো— যেমন পদদলিত হয়ে মৃত্যু বা সেতু ধসে পড়া— এসব ঘটনাও রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে সামনে আনে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দেখলে, এসব ঘটনা রাষ্ট্রের সাফল্যেরও প্রতিফলন। কারণ, ভারতে মানুষ ও বন্য প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বাড়ছে— এর একটি বড় কারণ হলো, দেশটি বন্য প্রাণী সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
বাঘের কথাই ধরা যাক। ১৯৭০-এর দশকে ভারতের জাতীয় প্রাণী বাঘ বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু আজ বড় ডোরাকাটা এই প্রাণীটি বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। গত দুই দশকে ভারতে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০-তে পৌঁছেছে। অথচ এশিয়ার অপেক্ষাকৃত ধনী ও কম জনবহুল কিছু দেশে, যেমন মালয়েশিয়ায়, বাঘের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভারত এতটাই সফল হয়েছে যে, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাঘের প্রজাতি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দেশটি কম্বোডিয়ায় বাঘ রপ্তানিতে সম্মত হয়েছে। ‘প্রজেক্ট টাইগার’, নামে পরিচিত এই সংরক্ষণ উদ্যোগ সত্যিই এক বিরাট সাফল্যের গল্প।
তবে এটিই একমাত্র সাফল্য নয়। কয়েক বছর আগে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটে এশীয় সিংহের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ধারণের জন্য একটি সংরক্ষণ এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের আসামের মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন, গত বছর রাজ্যে বিপুল ও ক্রমবর্ধমান গণ্ডারের জনসংখ্যার মধ্যে চোরাশিকার-সংক্রান্ত কোনো ঘটনা ঘটেনি। এসব সাফল্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সাল থেকে ভারত আফ্রিকা থেকে চিতা আমদানি করছে। ১৯৫২ সালে ভারতীয় ভূখণ্ডে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই প্রাণীটিকে আবার দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
জনসাধারণের মনোভাব ভারতের বন্য প্রাণী সংরক্ষণে সাফল্যের অন্যতম কারণ। অনেক বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীই হিন্দুদের কাছে শ্রদ্ধার বিষয়। আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, ভারতীয় সমাজে যেকোনো প্রাণীর ক্ষতি করাকে ভালো চোখে দেখা হয় না। এ ছাড়া এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রাণী সুরক্ষা আইনও বেশ কঠোর। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এটিও সহায়ক যে, সংরক্ষণের আওতাভুক্ত প্রাণীগুলো সাধারণত দেখতে আকর্ষণীয় এবং মানুষের ব্যাপক সমর্থন পায়। তবে মানুষের এই আবেগ এতটাই প্রবল যে, দেখতে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় প্রাণী—যেমন টাক মাথার, কুঁজো এবং মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া শকুন— সংখ্যায় বাড়ানোর জন্যও নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বন্য প্রাণী রক্ষা করা ভারতের নেতাদেরও দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে সম্রাট অশোক, যাঁর নাম অনুসারে এই কলামের নামকরণ করা হয়েছে, শিকার নিষিদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশ জারি করেছিলেন। আধুনিক ভারতের নেতারাও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। ১৯৭০-এর দশকের অধিকাংশ সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা ইন্দিরা গান্ধী ‘প্রজেক্ট টাইগার’ চালু করেছিলেন। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অন্যতম আগ্রহ বন্যপ্রাণীর ছবি তোলা।
ভারতের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সাফল্যের তৃতীয় কারণ হলো নীতিনির্ধারণের ধরন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজ করে যে পদ্ধতিকে নীতিবিশারদরা ‘মিশন মোড’ বলে থাকেন। অর্থাৎ সুস্পষ্ট ও সীমিত লক্ষ্য নির্ধারণ করে, সেই লক্ষ্য অর্জনে বিশেষায়িত দল গঠন করে কাজ করা। ভারতের জনস্বাস্থ্য খাতের বড় কিছু সাফল্য—যেমন পোলিও নির্মূল এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় দ্রুত টিকা কার্যক্রম চালু করা—এভাবেই অর্জিত হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও একই পদ্ধতি কার্যকর হয়েছে, যার সূচনা ‘প্রজেক্ট টাইগার’-এর মাধ্যমে। পরে এই উদ্যোগ থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে ‘প্রজেক্ট এলিফ্যান্ট’, ‘প্রজেক্ট স্নো লেপার্ড’, ‘প্রজেক্ট ডলফিন’ এবং ‘প্রজেক্ট রাইনো’-সহ আরও নানা প্রকল্প চালু হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলোর পেছনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ কাজ করছে। একটি হলো এক ধরনের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণভিত্তিক সরকারি প্রশাসন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার কাঠ সংগ্রহের জন্য ‘ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট সার্ভিস’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। স্বাধীনতার পর সেটিকে পুনর্গঠন করে বন ও বনের ভেতরের প্রাণীদের সুরক্ষায় কাজে লাগানো হয়। অন্য পক্ষটি হলো নাগরিক সমাজ—যার মধ্যে রয়েছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), পরিবেশবাদী, বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা। তাঁরা যেমন বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও পরামর্শ দেন, তেমনি রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিও নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন।
অবশ্যই ভারতের এই উদ্যোগগুলো পুরোপুরি নিখুঁত নয়। বরং এসব উদ্যোগের কারণে নতুন কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষ ও বন্য প্রাণীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত। তারপরও এটি বিস্ময়কর যে, তুলনামূলকভাবে দরিদ্র একটি দেশ, যার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা সীমিত এবং সম্পদের ওপর রয়েছে অসংখ্য দাবি, সেই দেশের মানুষ ও রাজনীতিকেরা একত্র হয়ে অন্য প্রাণীদের সুরক্ষার মতো নিঃস্বার্থ একটি কাজ সফলভাবে করতে পেরেছেন। ভারতের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এই সাফল্য দেশটির সর্বোত্তম দিকগুলোর একটি উদাহরণ।
এটি আরও প্রমাণ করে যে, আজ যেসব সমস্যাকে দুর্ভেদ্য বা সমাধানের অযোগ্য বলে মনে হয়, সেগুলোরও বাস্তবে সমাধান সম্ভব। যে দেশ একশৃঙ্গ গণ্ডার রক্ষায় প্রয়োজনীয় সম্পদ ও উদ্যোগ জোগাড় করতে পারে, সেই দেশ শুধু অর্থের সংকট বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যস্ততার অজুহাতে তার অসহনীয় বায়ুদূষণ, দূষিত ও দখলে জর্জরিত জলাধার কিংবা আবর্জনায় ভরা মাঠের সমস্যা সমাধান করতে না পারার দাবি করতে পারে না।
আর যদি নেতাদের কাছে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি দেশকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে না হয়, তাহলে হয়তো কোনো কৌশলী পরিবেশবাদী তাঁদের মনে করিয়ে দিতে পারেন—দূষণমুক্ত বাতাস ও পানি শুধু মানুষের জন্য নয়, বাঘ ও হাতির জন্যও উপকারী।